দিন আনে দিন খায় মজুররা দিশাহারা

58

রাজধানীর রায়েরবাজারের সাদেক খান সড়কে প্রতিদিন ভোরে দিনমজুরের হাট বসত। ঝুড়ি, কোদাল, শাবলসহ অন্য সরঞ্জাম নিয়ে হাটে ভিড় জমাতেন তাঁরা। মহাজনদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে কাজ ও মজুরি ঠিক করে চলে যেতেন কাজ করতে। দিন শেষে মজুরি নিয়ে বাজার করে বাসায় ফিরতেন। কিন্তু প্রতিদিনের এ চিত্র এখন আর দেখা যায় না।

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পর রাজধানীর চেনা চেহারা অচেনা হয়ে গেছে। মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে জরুরি সেবা ছাড়া সব কিছুই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে দুর্দশায় পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ।

বিভিন্ন বেসরকারি হিসাবে, রাজধানীতে কমপক্ষে ৪২ লাখ দিনমজুর এখন তীব্র সংকটে আছেন খাদ্যের পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘোষিত বরাদ্দ পাঁচ কোটির বেশি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ভাগ করলে মাথাপিছু মাত্র ১৫০ টাকা করে পড়ে, যা তাঁদের জীবনধারণের জন্য অপ্রতুল।

এ অবস্থায় আগামীকাল শুক্রবার মে দিবস পালিত হচ্ছে।

গাইবান্ধার ফুলছড়ির রোজিনা আক্তার স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন বছর আগে দুই সন্তানকে নিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। প্রতিবেশী এক নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে কামরাঙ্গীর চরে বাসা নেন। প্রতিদিন ৩০০ টাকায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছিলেন তিনি। প্রতিদিন ভোরে রায়েরবাজারের সাদেক খান সড়কের পাশে দিনমজুরের হাটে এলেই মিলে যেত কাজ। সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর হাটে এসে বসে থাকেন; কিন্তু কেউ কাজে নিতে আসে না। এখন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার ত্রাণের ওপরই তাঁর ভরসা।

জানা যায়, করোনা সংক্রমণের ভয়ে বেশির ভাগ মানুষ কাজ বন্ধ রেখেছে। কাজ নেই তো দিনমজুরের খাবারও নেই। সে কারণে অনেকেই সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করে গ্রামে ফিরে গেছেন। আবার কেউ কেউ ক্ষুধার জ্বালায় করোনার ভয় তুচ্ছ করে কাজের সন্ধানে প্রতিদিন হাটে আসেন; কিন্তু বেশির ভাগ দিনই শূন্য হাতেই ফিরতে হয়।

দুই সন্তানকে নিয়ে রায়েরবাজার পুলপাড়ের ছোট্ট টিনশেড ঘরে ভাড়া থাকেন দিনমজুর হাফিজুল। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, গত সপ্তাহে দুই দিন ছোট দুটি কাজ পেয়েছিলেন; কিন্তু তাতে এক দিনের খাবারও হয়নি। তাঁর স্ত্রী জেসমিন আক্তার অন্যের বাড়িতে ঠিকা কাজ করতেন। দুজনের আয়ে পাঁচজনের সংসার কষ্টেই চলত। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে দুজনই এখন কর্মহীন হয়ে পড়ায় প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি সংস্থা থেকে কিছু চাল-ডাল পাওয়াতে কয়েক দিন চলেছে। কিন্তু আগামী দিনগুলোর কথা ভেবে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন।

টাকা না থাকলে পণ্য কিনবেন কিভাবে—সেই প্রশ্ন করেন বসিলা চার রাস্তা মোড়ের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া জাকির হোসেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। আগে প্রতিদিন ভ্যানে করে মোহাম্মদপুর টাউন হলের পাশে একটি আসবাবের দোকানের মালামাল আনা-নেওয়া করতেন। দিন গেলে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হতো। সেখান থেকে নিজের খরচ ও গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের জন্য টাকা পাঠাতেন। কিন্তু গত দুই সপ্তাহে কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি। নিজের খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষেরা। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ না থাকায় তাদের উপার্জনের পথ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক, বাসচালক, চালকের সহকারী, গৃহকর্মী—এমন সব নিম্ন আয়ের মানুষ প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করা নিয়ে মহাসংকটে পড়েছেন। সহায়তা মিললেও সেটা যথেষ্ট নয়।-কালের কন্ঠ