কল্পনালতা

46

করোনার জন্য দেশজুড়ে সকল অফিস আদালত বন্ধ হয়ে গেল। অফিসের কাজকর্ম সব ভার্চুয়ালি চলবে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ পূর্বক ব্লু স্কাই কনজিউমারস্ এর অফিসও আগামী কদিন বন্ধ থাকবে বলে স্টাফদের জানিয়ে দেয়া হলো। অয়ন প্রথম ভেবেছিল, ভালই হলো। চাকুরির নিত্য ব্যস্ততার ফাঁকে নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটানো যাবে। এরি মধ্যে কয়েকদিন গেল। ছুটির ব্যাপ্তি আরো বাড়লো।

ব্লু স্কাই কনজিউমার্স নতুন পণ্যসমূহের মার্কেটিং প্রসেস আপাতত স্থগিত থাকবে বলে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে ভার্চুয়াল অফিস কার্যক্রমটাও সীমিত হয়ে পড়েছে। এখন হাতে অবারিত সময়, কিন্তু তেমন কিছু করার নেই। যেন জীবনের জাহাজটা নদীর কোন এক অজানা স্থানে এসে চরে আটকা পড়েছে। কখন এটি চলতে শুরু করবে, এ নিয়ে উৎকন্ঠা থেকে অস্থিরতার যন্ত্রণা দানা বাধছে, কিন্তু উদ্ধার পাবার কোন উপায় জানা নেই।

যেহেতু তেমন কিছু করার নেই, তাই সময়ে অসময়ে অয়ন বাসার এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। কে কি করছে দেখে। মাঝে মাঝেই দক্ষিণের বারান্দাটায় গিয়ে বসে থাকে। চতুর্থ তলার এই বাসাটার একটা ভাল দিক হলো দক্ষিণ আর পূর্বদিকটা খোলা। সারাদিনই রোদ-আলো ঝলমল করে। বাসা ভাড়া নেয়ার আগে তার বাবা বলে দিয়েছিলেন সেটার অন্তত পূর্বদিকটা অবশ্যই খোলা থাকতে হবে। বিশেষত সকালের রোদের প্রতি তার কেমন যেন একটা দুর্বলতা।

বারান্দাটায় একটা বেতের চেয়ার আর দুটো ছোট মোড়া। বেতের চেয়ারটাতে তার বাবা সময় সময় এসে বসেন। গ্রীল ঘেসে বেশ কয়েকটা ফুলের টব। সেখানে লাল আর সাদা গোলাপ, সাদা চাঁপা, গন্ধরাজ, নয়নতারা আর গাঁদা ফুলসহ পাতাজাতীয় কিছু চারার গাদাগাদি সজ্জা যেন এক ধরণের প্রশান্তিময় ঝোপের সৃষ্টি করেছে। নানাবিধ চারা সংগ্রহের এই কাজগুলো মৃত্তিকা বেশ নিষ্ঠার সাথে করে।

মৃত্তিকা অয়নের স্ত্রী। স্ত্রী মানে সংসারের সদস্য একজন বৃদ্ধি, মৃত্তিকা সম্পর্কে এর বেশী কিছু ভাবার অবকাশ সেভাবে হয়ে উঠেনি অয়নের। এর পেছনে একটি কারণ আছে, যা কিনা শুরুতেই একটু বিস্তৃত করা আবশ্যক।

অয়ন মৃত্তিকাকে বিয়ে করেছে তার নিজের পছন্দে নয়। তার বাবা আশেক মাহমুদের পছন্দে। আশেক মাহমুদ কেমন যেন আর দশটা মানুষের মতো নন। এক স্বপ্নীল জগতে তার বসবাস। অয়নের শ্বশুর শামসুল হক খানও প্রায় একই ধাচের। দুইজনই ছিলেন মফস্বল শহর পলাশপুর কলেজের শিক্ষক। আশেক মাহমুদ ইংরাজীর আর শামসুল হক খান বাংলার। তাদের দুজনের সেই অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের ফল হিসেবে অয়নের জীবনে স্ত্রী হিসেবে মৃত্তিকার আবির্ভাব। মৃত্তিকার ব্যাপারটা হয়েছে অনেকটা কাপড়-চোপড় গুছিয়ে সেজেগুজে চেনা-শোনা ঘনিষ্ট পড়শিদের দেখতে এসে সেখানে থেকে যাওয়ার মতো।

পরিবার, শ্বশুর-শ্বশুড়ি, রীতি-সংস্কৃতি সবই পূর্ব থেকে পরিচিত। সেসবের মধ্যে একমাত্র পাত্রের সাথেই পাত্রীর জানাশোনাটা তুলনামূলক কম। কারণ মৃত্তিকাকে অয়ন সেই ছোট বেলায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখত। মৃত্তিকা মাথা দুলিয়ে গান গাইত। শ্যাম বর্ণের মাঝারি গড়নের সেই মেয়েটি বেশ ভাল গাইয়ে হিসেবে নাম করে ফেলে গোটা পলাশপুর জুড়ে। তার বাবা আশেক মাহমুদও তার গানের ভক্ত হয়ে পড়েন। সেই মেয়ের মধ্যে কি যেন কি অমূল্য রতনের সন্ধান পেলেন বাবা। অথচ লেখাপড়ায় তার আহামরি কোন সাফল্য নাই। গড়পড়তা সেকেন্ড ডিভিশন পাওয়া মেয়ে সে।

অন্যদিকে অয়ন তার বিপরীত। সেই ছোটবেলা থেকেই বেশ ভাল ছাত্র। ক্লাশে প্রথম স্থানটি তার জন্য নির্ধারিত। বাবা আশেক মাহমুদ অবশ্য পরীক্ষায় প্রথম হওয়াটাকেই জীবনের একমাত্র সাফল্য মনে করতেন না। মনে আছে অয়ন যখন কেবল বানান করে পড়তে শিখেছে, তখনই তিনি শিশুপাঠ্য ঠাকুরমার ঝুলি তাকে ধরিয়ে দেন। সেই সময় সে রূপকথার গল্পগুলো অয়নের বেশ ভালও লাগত। এরপর কত বিচিত্র রকমের বই যে সে পড়েছে!

তার বাবা আশেক মাহমুদ বলতেন, যত পার বই পড়। বই না পড়ে বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে লাভ নেই। অবশ্য উপরের ক্লাশে পাঠ্য বইয়ের বাইরে তেমন সময় দিতে পারত না সে। বাবা আশেক মাহমুদও এর পরে আর এনিয়ে পীড়াপীড়ি করেন নাই। ক্রমেই তার নিত্য রুটিন হয়ে উঠেছে পাঠ্য বই মুখস্ত করা, এখানে সেখানে ভাল শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়া, কোচিং করা, নোট সংগ্রহ করা, মডেল টেস্ট দেয়া এসব।

অয়ন তখন মাস্টার্স শেষ করে চাকুরিতে ঢুকেছে। বেশ ভাল বেতন। পাশাপাশি উইকেন্ডে এক্সিকিউটিভ এমবিএও করছে। ঢাকার লালমাটিয়ায় চৌদ্দশ স্কয়ারফিটের এই বাসাটি ভাড়া নিয়েছে। মা-বাবাকেও নিয়ে এসেছে এখানে। তখনি তার বাবার অতি আগ্রহে মৃত্তিকার সাথে অয়নের বিয়ে হয়ে যায়। তার মা অবশ্য সময় নিয়ে দেখে শুনে এগুতে চেয়েছিলেন। আশেক মাহমুদ তখন তাকে বুঝান, তাদের বয়স হয়েছে। মেয়ে কাজরিরও বিয়ে হয়ে গেছে। এখন ঘরে একটা বউ থাকাটা জরুরি। জীবনের শেষ কটা দিন একটু সুখে শান্তিতে কাটিয়ে যাই।

মা নিলুফার শামসুল হক খান সাহেবের মেয়ে মৃত্তিকার প্রতি স্বামীর দুর্বলতার কথাটা জানত। তারও মেয়েটাকে অপছন্দ নয়। তবে গায়ের রংটা একটু শ্যামলা। খুব বেশী লম্বাও নয়। আশেক মাহমুদের বক্তব্য হলো, মেয়ে শ্যামলা হলেও গুণবতী। সংসারের জন্য এমন লক্ষ্মী মেয়েই দরকার। তাছাড়া দিনকাল যা পড়েছে, কোন অজানা অচেনা ফ্যামিলির এক মেয়েকে বিয়ে করিয়ে নিয়ে আসব। শেষে দেখা গেল সংসারের শান্তিটাই নষ্ট হয়ে গেল।

অয়নের সামনে নিলুফার কথায় কথায় মৃত্তিকার প্রসঙ্গটা উঠায়। উদ্দেশ্য, তার নিজস্ব পছন্দ আছে কিনা তা জেনে নেয়া। অয়ন তখন ফেল ফেল করে কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকল। বলল, ‘মৃত্তিকা, মানে খান চাচার ছোট মেয়ে না? ওই যে নানা অনুষ্ঠানে গান গাইত?’

নিলুফার তার মত জানার চেষ্টা করে, ‘তুই সেই কিছুদিন আগেওতো তাকে দেখেছিস। আমরা যখন পলাশপুর গেলাম ভাড়াটিয়াকে বাসা বুঝিয়ে দিতে, তখনতো তোর খান চাচার সাথে মৃত্তিকাও এসেছিল। তোর মনে নেই?’

‘ও আচ্ছা। তখন আব্বার সাথে বাসা গোছগাছে ব্যস্ত ছিলামতো, সেভাবে খেয়াল করি নাই।’ বলেই টেবিলের উপরের স্পাইরাল বাইন্ডিং করা মোটা ভলিউমগুলো সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নিলুফারও কিছুক্ষণ অয়নের টেবিলের পাশের চেয়ারটায় চুপচাপ বসে থাকলেন। কিছুক্ষণ পর অয়ন কি ভেবে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘খান চাচার ঐ মেয়ে কি করে এখন?’

‘ইডেন কলেজে বাংলায় ভর্তি হয়েছে গত বছর। হোস্টেলে থাকে।’ কিছুটা নির্লিপ্ত জবাব নিলুফারের, ‘তুই কি জানিস তোর বাবা মৃত্তিকাকে খুবই পছন্দ করে?’ উত্তরের অপেক্ষা না করে তিনি আবার বললেন, ‘তোর বাবা পছন্দ করে বলেই যে সেই মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে এমন কোন কথা নেই। তোর কোন পছন্দ থাকলে আমাকে জানাস।’

বিশ^বিদ্যালয়ে সহপাঠিনীদের সাথে অয়নের বেশ ভাল বন্ধুত্ব থাকলেও বিশেষ কারো সাথে তা প্রেম-ভালবাসা পর্যন্ত গড়ানোর অবকাশ পায়নি। সে দেখেছে, পরীক্ষায় প্রথম শ্রেনী পাওয়া যতটা সহজ, বিশেষ কাউকে ভবিষ্যৎ জীবন সঙ্গিনী ভেবে পরিচর্যা করে পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছানো ততটা সহজ নয়। মৃত্তিকার সাথে তার বিয়ের প্রসঙ্গটা আসার পর বেশ ক’বার ভেবে দেখেছে সে। তবে চুড়ান্ত কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে নাই। শেষ পর্যন্ত ‘বাবা-মা যা করে করুক’ এমন একটা নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে বসে থাকে সে।

শেষে অনেকটা অনাড়ম্বর ভাবেই অয়নের সাথে মৃত্তিকার বিয়ে হয়ে যায়। অয়নের বিবাহিত জীবনের প্রথম কয়েকটা দিন মনো-দৈহিক রস-রহস্য আস্বাদনের ঘোরেই কেটে গেল। বাসর রাতের ঘটনাগুলো ছিল বেশ এলোমেলো।

সারা দিনের ধকল শেষে বেশ ক্লান্ত ছিল অয়ন। মৃত্তিকাকে কেমন যেন চেনা জানা আর দশটা মেয়ের মতোই লাগছিল। আজকাল পার্লারের সাজসজ্জা নারীর অবয়বটা এমন ভাবে বদলে দেয় যে, সকল নারীকেই বধুবেশে কেমন যেন একই রকম দেখায়। সেই রাতের তেমন কোন খুটিনাটি ঘটনা মনে পড়ে না অয়নের।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেও বিছানায় আলস্যে গড়াগড়ি যাচ্ছিল অয়ন। এক ফাঁকে মৃত্তিকার দিকে তার চোখ গেল। মৃত্তিকা গোছল সেরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আনমনে এলো চুলে চিরুনি চালাচ্ছিল। আয়নার ভেতর মৃত্তিকার সত্যিকারের মুখটা সে দেখল তখন। সেই সব সাজসজ্জার বর্ণিল রং তখন আর নেই।

সুঠাম ভরাট দেহখানার শাখা প্রশাখায় ফুটে উঠা যৌবনের পুষ্পরাজি নেশার ঘোরে যেন দেখছিল সে। আস্তে করে উঠে গিয়ে মৃত্তিকার পাশে বসল। দুই হাত কাধে রাখল তার। বলল, ‘তোমাকে বেশ লাগছেতো? রাতেতো এত ভাল লাগে নাই?’

মৃত্তিকা আঁতকে উঠে বলল, ‘ও, আপনি? আমিতো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’

হেসে হেসে অয়ন বলল, ‘ভয় পাবে কেন? এ ঘরে আমি যে আছি, তাতো তোমার জানা। তাই না?’

‘আপনি থাকলেই কি, না থাকলেই কি? একজন বোবা মানুষের উপর ভরসা কি?’

মৃদু হেসে অয়ন বলল, ‘ঠিকই বলেছ। তোমার সাথে রাতে সেভাবে গল্প করা হয়নি। সরি। আসলে সেভাবে গল্প করতে জানিও না। কি করব বল।’

অয়নের দিকে দুষ্টুমির তীর্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, ‘গল্প না জানলেও অসভ্যতাতো ষোল আনাই জানা হয়েছে।’

অয়ন কেমন যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। মৃত্তিকা আবারো চুল আচড়াতে আচড়াতে বলল, ‘খালি পরীক্ষায় ভাল রেজাল্টই করেছেন। মানুষ হন নাই এখনো।’

খিক করে হেসে দিল মৃত্তিকা। অয়নও হেসে দিল। বলল, ‘তুমি বেশ দুষ্টুতো? এত্ত কথা জান?’

‘অসুবিধা নাই। আপনাকে মানুষ করে তুলতে হবে। সে অনেক পরিশ্রমের কাজ।’

এরপর মৃত্তিকা অয়নকে মানুষ করার কাজে লেগে গেল। একদিন কবিগুরুর ‘শেষের কবিতা’ ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘নিন, পড়বেন। সময় নিয়ে পড়বেন। ইন্টারেস্ট পাবেন।’

মৃত্তিকা তার স্বামীকে কিভাবে পেতে চেয়েছে, আর কি প্রক্রিয়ায় মানুষ করতে চেয়েছে, এ থেকে তার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষণে বিষয়টার আরেকটু গভীরে যাওয়া আবশ্যক।

সেই স্কুল জীবনে ক্লাশ সেভেন এইট থেকেই অয়ন বই মুখস্ত করে ভাল ফল লাভে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে। সেই বিদ্যা অস্থি-মজ্জা ভেদ করে হৃদয়তন্ত্রীতে নাড়া দিল কি দিল না সেটা সেখানে মুখ্য নয়। শিক্ষা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্বীকৃতি স্বরূপ পাওয়া ভারী ভারী সনদই এখানে মুখ্য।

একের পর এক সেইসব সনদ লোভনীয় বৃত্তির মূলধন হিসেবে তার হিসাবের খাতায় জমা হয়ে সঞ্চয়ের স্থিতিটাকে বাড়িয়ে তুলেছে। অন্যদিকে মৃত্তিকাও বই পড়েছে। সেই ক্ষেত্রে মনের আনন্দটাই মুখ্য হয়ে থেকেছে।

পাঠ্যসূচি প্রণেতাগণের নির্দেশনামতো সঠিক পাঠ মস্তিষ্কে ধারণ করে পরীক্ষার খাতায় যথাসময়ে জাহির করে আসার মতো চালাকিটা সে আয়ত্ত করতেই পারে নাই। ফলে তার অর্জিত বিদ্যা তাকে উত্তম ফল লাভে তেমন সহায়তা করে নাই। তাই বলে তার সে প্রবৃত্তিতে উৎসাহেরও ভাটা পড়ে নাই। দৈনন্দিন কাড়ি কাড়ি সময় এই কাজে প্রতিনিয়ত অপচয় হয়ে এসেছে, যা নিয়ে তার তেমন অনুশোচনাও দেখা যায় না। ফলশ্রুতিতে আর কিছু হোক বা না হোক, তার মধ্যে আত্ম-মর্যাদাবোধটা বেশ প্রখর হয়ে উঠেছে।

বিবাহের কয়েকটা দিন যেতে না যেতেই অয়ন অফিসের কাজে আবারো ডুবে যায়। ব্লু স্কাই কনজিউমারস্ এর প্রডাক্ট মার্কেটিং সেকশনটি তাকেই দেখভাল করতে হয়। কম্পিটিশন স্টাডি, কাস্টমার টার্গেটিং, মার্কেটিং স্ট্রাটেজি এন্ড টাক্টিক্স- এসব নানাবিধ বিষয় তার মাথায় গিজগিজ করতে থাকে সারাক্ষণ।

শিল্পসাহিত্যের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার সময় থাকে না। এরই মধ্যে মৃত্তিকার কথা রাখতে ‘শেষের কবিতা’ বইটা হাতে নেয়। অল্প কয়েক পৃষ্ঠার বই। ভাবে, কতক্ষণ আর লাগবে। কিন্তু মনোযোগ বসাতে পারে না। পরীক্ষায় ভাল করার জন্য খুব দ্রুত পড়ে যাওয়ার ‘স্কিম থ্রো’ পদ্ধতিটা খাটানোর চেষ্টা করল। এতে কাহিনীটা মোটামুটি জানা হলো। এই পর্যন্তই।

পরে এক সন্ধায় বেডরুমে বসে মৃত্তিকা তার অনার্সের পড়া দেখছিল। অয়ন শুয়ে পত্রিকা পড়ছিল। ততদিনেও মৃত্তিকার ‘আপনি’ সম্বোধনটা ‘তুমি’ পর্যন্ত পুরোপুরি পৌঁছায় নি। এক ফাঁকে মৃত্তিকা অয়নের দিকে তাকাল। দেখে অয়নও তার দিকে চেয়ে আছে। মৃত্তিকা খিক্ করে হেসে দিল।

‘খুবতো গোপনে গোপনে মেয়েদের দেখা হয়। আমিতো ভাবলাম, জনাব পত্রিকাই পড়ছেন।’

অয়নও হেসে দিল। বলল, ‘মেলানোর চেষ্টা করছিলাম।’

মৃত্তিকা উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকল।

‘তুমি ছোট বেলা গান গাইতে না নানা অনুষ্ঠানে? তোমাকে দেখলে এখনো আমার চোখে সেই ছবিটাই ভেসে উঠে। কেমন যেন এখনো বউ হয়ে উঠোনি।’ বলে অয়ন দুষ্টুমির হাসি হাসল।

মৃত্তিকা উঠে এসে অয়নের পাশে বসল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘তুমি কত ভাল রেজাল্ট করলে, কত ভাল কেরিয়ার তোমার সামনে। আমিতো সে তুলনায় তেমন কিছু না। তোমার কি কখনো মনে হয় যে আরো অনেক ভাল বউ পেতে?’

‘সেভাবেতো ভাবা হয়নি? তুমি যখন মনে করিয়ে দিলে, এবার ভেবে দেখব।’ বেশ জোরে হেসে দিয়ে মৃত্তিকাকে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে অয়ন।

মৃত্তিকা ভ্রু কুচকে কৃত্রিম বিরক্তির ভাব দেখিয়ে বলে,‘লাগছে কিন্তু, ছাড়ো।’ কিন্তু ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে না। এক ফাঁকে মুখ টান টান করে বলল, ‘বইটা কি জনাবের পড়া হয়েছে?’

‘সেই চটি বইটা? কবে পড়ে ফেলেছি?’

‘তাই নাকি। তাইতো দেখছি, অমিত বাবুর আছর কিছুটা হলেও পড়েছে।’

অয়ন মনে মনে ভাবে, অমিত বাবুটা যেন কে? হ্যাঁ, মনে পড়েছে। সেই আঁতেল প্রেমিক। যে কিনা সারাদিন কবিতা আওড়ে বেড়ায়, আসল কাজের বেলায় ঠন ঠন। কিন্তু মুখে কিছু বলে না। এ যাবৎ সাহিত্যের উপর তার পড়াশোনার দৌড় যতদূরই থাকনা কেন, এইটুকু তার ধারণা অন্তত হয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথের কোন লেখা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করার মতো বুৎপত্তি তার এখনো হয়ে উঠে নাই।

ওদিকে অয়নের খ্যাতি আর যশের উচ্চাকাঙ্খাতো আগে থেকে ছিলই, এখন সেটা আরো বুদ হয়ে বসেছে মাথার উপর। প্রডাক্ট মার্কেটিংএর বিষয়টা সে বেশ বুঝতেও শুরু করেছে। পরিবর্তনশীল পরিবেশ-পরিস্থিতি-প্রেক্ষাপট কিভাবে প্রডাক্ট মার্কেটিং এর উপর প্রভাব ফেলে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে কিভাবে প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করা যায়, সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানের ধার্যকৃত প্রবৃদ্ধি কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ, জরিপ, তত্ত্ব-তথ্য নিয়ে পড়ে থাকে সে দিন রাত। কর্পোরেট চাকুরির একটা সুবিধা হলো, যথাসময়ে দক্ততা আর সাফল্যের মূল্যায়ণটা পাওয়া যায়। ফলে অয়নের মাথায় সারাক্ষণ বুদ বুদ করতে থাকে এপ্রিসিয়েশন, ইভালিউয়েশন, ইনক্রিমেন্ট, এলিভেশন এর মতো লোভনীয় কিছু টার্ম। উচ্চাকাঙ্খার সেই অদৃশ্য পাগলা ঘোড়া যেন তাড়িয়ে নিয়ে যায় তাকে।

ইতোমধ্যে ব্লু স্কাই কনজিউমারস্ কয়েকটি ওটস্ প্রডাক্টস্ বাংলাদেশে মার্কেটিং এর সিদ্ধান্ত নেয়। পূর্বের দক্ষতা আর সফলতার ধারাবাহিকতায় এর মূল দায়িত্বটি পড়ে অয়নের উপর। সে দেখল, দক্ষতা আর কৃতিত্ব দেখিয়ে কোম্পানীতে তার অবস্থানটা পাকাপোক্ত করে নেয়ার এটা একটা বড় সুযোগ। ফলে অফিসের কাজে তার নিবিষ্টতা আরো বাড়ে। বাসায়ও ফাঁকে ফাঁকে এর উপর সময় দেয়, প্রাসঙ্গিক রিপোর্টগুলো নাড়াচাড়া করে।

অন্যদিকে এই পরিবারে মৃত্তিকার কাজেরও যেন শেষ নেই। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে শ্বশুর-শ্বাশুরির বিছানাপাতি গুছিয়ে দেয়া, ছুটা কাজের মহিলা হেলেনাকে কাজ বুঝিয়ে দেয়া, সকলের নাস্তা টেবিলে সাজিয়ে দেয়া-ইত্যাদিতো আছেই। সেই সাথে আছে তার নিজের পড়াশোনা। সপ্তাহে দুই একবার ছায়ানটেও যায় সে। মাঝে মাঝে ভোরবেলা সময় পেলে লিভিং রুমে বসে তানপুরায় রেওয়াজ করে, খেয়াল চর্চা করে। অয়নের ব্যাপারেও মৃত্তিকার মনোযোগের কমতি নেই। সকালে নাস্তা খাবার সময় প্রায়ই পাশে বসে থাকে। এটা সেটা এগিয়ে দেয়। অফিসের ব্যাগ গুছিয়ে দেয়। যাবার সময় দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে। আবার সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরলেও সেই একই যতœ আত্তি, একই মনোযোগ, সমুদয় আয়োজন পরিপাটি, নির্বিবাদ, মসৃণ। সারাদিনের অফিস শেষে বিশেষ করে ডিনারের সময় মৃত্তিকা স্বামীকে বেশ মনোযোগ দিয়ে খাওয়ায়। পাশে বসে এটা সেটা এগিয়ে দেয়। ভাল ভাল খাবার এগিয়ে দিয়ে খেতে সাধাসাধি করে। বলে, ‘আরেক টুকরা মাছ নাও না। যা পরিশ্রম কর, শরীর ঠিক রাখতে হলে তোমার বেশী করে প্রোটিনটাতো খাওয়া উচিত। এই যে আরেক টুকরা উঠিয়ে দিলাম।’

এসব ক্ষেত্রে অয়ন স্বভাসুলভ নম্রতার সাথে বলে, ‘না, থাক। আজ অনেক খাওয়া হয়ে গেছে। থেংক ইউ।’

এসবই নিত্য সংসার-সূচির পরিচিত ধারায় চলতে থাকে। অয়নদের সুনসান ছোট্ট পরিবার। সেখানে বাবা আছেন, মা আছেন, কাজরিও আছে, যদিও এখন সে স্বামীর সাথে সিলেটে। তার সাথে নতুন যোগ হলো এই মৃত্তিকা। আগে মা অয়নের যে যতœ আত্তি করতেন, তার বেশীর ভাগেরই দায়িত্ব এখন নিয়েছে মৃত্তিকা।

সময় বয়ে চলে। জীবনও বয়ে চলে সেই একই প্রবাহে, একই ছন্দে। জীবনের সেই ছন্দোবদ্ধ মসৃণতাটাকে আরো গম্ভীর করে তোলে মৃত্তিকার নির্মল, পরিতৃপ্ত আর নির্বিবাদ সম্ভ্রম। চৈত্র-বৈশাখে দখিনা সমীরন সবুজ ফসলের উপর দিয়ে যেমন দিনভর একই ছন্দে ঢেউ তোলে যায়, মসৃণতার আবর্তে অয়নের কাছে মৃত্তিকাকেও তেমনই মনে হয়। সেখানে কালেবর্তে চপল বাতাসের হঠাৎ ঘূর্ণিপাক যে বৈচিত্র তৈরী করে, সে বৈচিত্রটুকু তার মধ্যে যেন দেখা যায় না। অয়নের চেনা-জানা নিত্য পরিবর্তনশীল গতিময় জগতে সে যেন এক আগন্তুক হয়ে বিরাজ করতে থাকে।

অয়নের সে বাহির জগত মৃত্তিকার কাছেও দুর্বোধ্য। তবে অয়নের মনের কোণে একটা অজানা অতৃপ্ততা যে মাঝে মাঝে তাকে অস্থির করে তুলে, তা বুঝতে পারে সে। সে বুঝতে পারে অয়নের বাহিরের জীবনের সাথে গৃহের জীবন কেমন যেন খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছে। চাকুরির মতো সংসার জীবনেও সে কেমন যেন এক ধরণের নৈর্বক্তিক ফল পেতে চায়। জীবনের আত্মমাত্রিকতার বিষয়গুলো যে নৈর্বক্তিকতার অতীত, তা যেন মাঝে মাঝে সে অনুধাবন করতে ভুলে যায়।

মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ আর মহত্ব অর্জনে ভাল ভাল পুস্তক বড় ভূমিকা রাখে-এই ধারণা মৃত্তিকার মজ্জাগত। তাই স্বামীর মঙ্গলের জন্য তার চেষ্টাও সেমতে চলতে থাকে। বিয়ের বছর খানেক পর অয়নের জন্মদিনে মৃত্তিকা বেশ উৎসাহ ভরে কবিগুরুর ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থটি তাকে উপহার দেয়। এর মাস খানেক পরে কোন এক ছুটির দিনে সন্ধ্যার অবসরে জিজ্ঞেস করে সে, ‘হ্যাগো, ‘সোনার তরী’ র দু’একটা কবিতা কি পড়েছিলে?’

অয়ন বেড রুমের ছোট্ট স্টাডি টেবিলটায় বসে আনমনে প্রডাক্ট সার্ভে’র একটা ভলিউমের পাতা উল্টাচ্ছিল। মৃত্তিকার এ প্রশ্নে সে মনে মনে কিছুটা বিরক্ত হয়। সে বিরক্তির কিছুটা তার কুচকানো ললাটের ফাঁকে যেন প্রকাশ পেয়ে যায়।

‘নাহ্। পড়ার সময় পাই নাই। আর এত্ত ঝামেলায় এসব সাহিত্য-টাহিত্য পড়ার সময় কোথায়? আর এসব পড়ে লাভইবা কি?’ জবাব দেয় অয়ন।

কথাটা মৃত্তিকার গায়ে কেমন যেন লাগল। বলল, ‘শিল্প-সাহিত্য কোন লাভ-ক্ষতির বিষয় না।’

অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। সে জানে, শিল্প-সাহিত্য মৃত্তিকার মনে একটা স্পর্শকাতর জায়গা দখল করে আছে। হয়তবা এই স্পর্শকাতরতাটা উত্তরাধিকারসূত্রে তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া। হাতের ভলিউমটা টেবিলে রেখে দিয়ে খাটে এসে হেলান দিয়ে মৃত্তিকার পাশে বসল সে। বলল, ‘কথাটা আমি সেভাবে বলিনি। ডুন্ট মাইন্ড। সময় পেলে বইটা পড়ে দেখব।’

এরপর দুজনেই চুপচাপ। কিছুক্ষণ এভাবে গেল। অয়ন পরিবেশটা হালকা করার জন্য বলল, ‘তোমার সঙ্গীত চর্চা চলছে কেমন?’

‘কোন রকম।’ আস্তে করে জবাব দেয় মৃত্তিকা।

‘ছোটবেলা অনুষ্ঠানে ভালইতো গাইতে। এখন টিভি চ্যানেল ট্যানেলে চেষ্টা করে দেখ। ভাল শিল্পীর চাহিদাতো সবখানেই আছে।’

‘চ্যানেলে গাওয়ার জন্য আমি চর্চা করি না।’

‘চ্যানেলে গাইলে অসুবিধা কি? এত শ্রম দিচ্ছ, সময় দিচ্ছ, সেগুলোর একটা মার্কেট ভেল্যু পেতে। তোমার উৎসাহটাও বাড়তো।’

একটু সময় নিয়ে মৃত্তিকা দৃঢ়স্বরে বলল, ‘আমি সুরের চর্চা করি আমার নিজের জন্য। নট ফর এনি এক্সচেঞ্চ। সেখানে আমি সান্তনা পাই, আশ্রয় পাই।’

মৃত্তিকার দৃষ্টি যেন সুদূরে নিবদ্ধ।

অয়ন আর কোন কথা বলল না। বুঝল, শিল্প-সাহিত্য নিয়ে মৃত্তিকা এক ভাবের জগতে পড়ে আছে। সেই জগতটা সেভাবে নাড়াচাড়া করে অয়নের দেখা হয়ে উঠেনি। তবে সে দেখেছে, অনেকেই আজকাল এসব বিষয়কে কমার্শিয়ালিও ব্যবহার করছে। মার্কেটে এসবের বেশ চাহিদাও তৈরী হয়েছে। কিন্তু মৃত্তিকা বিশেষ করে তার সঙ্গীত চর্চার বিষয়টিকে অন্তরের কোন এক অজানা নিভৃতে এমনভাবে গচ্ছিত রেখে আসছে যে, বাস্তব জগতের ইকোনোমিক্স এর থিওরির আলোকে তাকে জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা করা বৃথা।

মৃত্তিকাও এরপর আর কথা বলল না, হাতের কাছের একটা বই নিয়ে আনমনে পাতা উল্টাতে লাগল।

মৃত্তিকা খেয়াল করে দেখেছে, আজকাল মাঝে মাঝে অয়ন তাকে কেমন যেন এড়িয়ে থাকতে চায়। কখনও কখনও তার সাহচর্যটাও যেন বিরক্তিকর ঠেকে তার কাছে। বিষয়টা তার কাছে পীড়াদায়ক হয়ে উঠে কখনো কখনো। যেমন সেদিন ডিনারের টেবিলে অয়ন মৃত্তিকার সাথে কেমন যেন একটু রুঢ় আচরণই করে বসল। মৃত্তিকা বোয়াল মাছের একটা বড় টুকরা অয়নের পাতে উঠিয়ে দিচ্ছে। অয়ন বাধা দিয়ে বলল, ‘রাখতো। এতবড় টুকরা আমি খেতে পারব না।’

মৃত্তিকাও বায়না ধরে, ‘নাওনা, বোয়াল মাছতো তুমি পছন্দ কর। নাও।’ বলে আবার উঠিয়ে দিতে যায়। অয়ন বিরক্তির দৃষ্টিতে মৃত্তিকার দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে কেমন যেন এক ধরণের বিতৃঞ্চার লক্ষণ দেখতে পায় মৃত্তিকা। বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে সে। মনে কষ্ট পায়। ‘সরি’ বলে আস্তে করে উঠে যায় সে।

মৃত্তিকার সে রাতে ভাল ঘুম হলো না। তার প্রতি অয়নের এই নির্লিপ্ততা আর বিরক্তির কারণটা বুঝার চেষ্টা করে সে। মাঝে মাঝে মনকে এই বলে সান্তনা দেয় যে, কর্পোরেট হাউজের চাকুরির কালচারটাই হয়ত এরকম। কিন্তু সেই সান্তনার প্রবোধ যেন প্রায়ই অন্তর পর্যন্ত পৌঁছুতে চায় না। এক ধরণের শূণ্যতা তাকে যেন ঘিরে ধরে। সেই সাথে মনের গহীন কোণে এক ধরণের আশংকাও চিন চিন করে উঠে। তাহলে কি সে সুখী করতে পারছে না তাকে? নাকি এর মাঝখানে অন্য কেউ জড়িয়ে পড়েছে? না, সেভাবে ভাবতে চায় না মৃত্তিকা।

সারাদিনে শুবার আগেই অয়নকে কিঞ্চিৎ সময়ের জন্য অবসর পায় সে। এটা সেটা জিজ্ঞেস করতে চায়। কিন্তু সবসময় ভরসা পায় না। সেদিন পাশে বসে বলল, ‘তোমার কি অফিসে কোন ক্রাইসিস যাচ্ছে? তোমাকে সারাক্ষণ টেনস্ড দেখিতো?’

অয়ন ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘হু? না, তেমন কিছু না। নতুন কিছু প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করছি। সেগুলোর সাকসেসের উপর আমার ফিউচার প্রমোশন টমোশন নির্ভর করছে। ভাল একটা পারফরমেন্স দেখানোর সুযোগ পাওয়া গেলতো—-।’ কথা যেন শেষ করল না সে।

‘এত টেনস্ড থাকলে পরে শরীর খারাপ করে যদি? না, আমি বলছিলাম কি, তুমি তোমার ক্যাপাসিটি অনুযায়ী চেষ্টা করে যাবে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু বাসায়ও অফিস নিয়ে পড়ে থাকবে, মুড অফ করে রাখবে, এটাতো ভাল দেখায় না, তাই না?’

অয়ন মৃত্তিকার দিকে মুখ ফিরিয়ে এক পলক তাকাল। পরক্ষণেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলল, ‘ব্যাপারটা সেরকম না। একটু এনগেজড্ থাকতে হয় আর কি। বিজনেস পলিসি, স্ট্র্যাটেজি এসব ভেরি চ্যালেঞ্জিং। এভরি ট্রিফল ম্যাটারস্ দেয়ার। তুমি অবশ্য বুঝবে না সেসব।’

‘তাই বলে পরিবার, সংসার এসবও তো ফেলনা নয়, তাই না?’

অয়ন এবার কিছুটা বিরক্ত হয়ে তাকাল মৃত্তিকার দিকে। বলল, ‘কেন, কোন অসুবিধা হচ্ছে? সংসারের কোন কিছুর কি অভাব পড়েছে?’

মৃত্তিকাও মুদু অথচ দৃঢ় স্বরে বলল, ‘টাকা পয়সাটাই সংসারের সব নয়। এটা একটা মমতা আর ভালবাসারও জায়গা।’

অয়ন স্বগতোক্তির স্বরে বলল, ‘মমতা আর ভালবাসাতো আর উড়ে চলে যাচ্ছে না। জীবনে এসটাব্লিস্ড হতে পারলে প্রেম-ভালবাসা সবই থাকে, না পারলে কিছুই থাকে না। দেটস্ রিয়ালিটি।’

মৃত্তিকা অনেকটা জেদের সাথে বলল, ‘এসটাব্লিশমেন্ট, আউটপুট, স্ট্যাটাস- এসব তোমাদের বিজনেস ওয়ার্ল্ড এর টার্মস্। জীবনে সুখ না থাকলে, আনন্দ না থাকলে এগুলোর সবই মিনিংলেস্।’

অয়ন আর কোন কথা বলল না। পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।

মৃত্তিকা অয়নের বিষয়ে আর বাড়াবাড়ি করে না, সে তার মতো থাকার চেষ্টা করে। সাংসারিক কাজকর্ম আর আচার চলে সেই চেনা নৈমিত্তিক ছন্দে। সকালে সব গোছগাছ করে দিয়ে মৃত্তিকা কলেজে যায়, ক্লাশ করে, বান্ধবীদের সাথে টুকটাক গল্প করে। সপ্তাহে দুই একদিন ছায়ানটে যায়। মাঝে মাঝে শ্বাশুরী-মাকে নিয়ে টুকটাক কেনাকাটা করতে আশে পাশের মলে যায়। এভাবেই চলে যায় মৃত্তিকার দিনকাল।

অয়নের জীবনও চলে তার মতো করে। সকাল সন্ধ্যা অফিস শেষে রাতে এসেও স্পাইরাল বাইন্ডিং করা বড় বড় ভলিউম নিয়ে বুদ হয়ে থাকে সে। মাঝে মাঝে টিভিতে নিউজ দেখে। এর ফাঁকে কদাচিৎ মৃত্তিকার সাথে তার কথা হয় তার, যার বেশীর ভাগই সংসারের নানাবিধ চাহিদা সংক্রান্ত। তার সাথে একটুখানি একান্ত সময় কাটানোর অবকাশই হয় না অয়নের। রাত্রির নিকষ অন্ধকারে আদিম জৈবিক আস্বাদ, সেটাও যেন তার কাছে ক্রমেই নৈমিত্তিক অভ্যস্ততারই অনুসঙ্গ হয়ে পড়ে।

সেদিন লাঞ্চের পর অয়ন তার সহকর্মীদের সাথে ওটস্ প্রডাক্টের মার্কেটিং স্ট্যাটিজি নিয় জরুরী আলোচনা করছিল। এক ফাঁকে স্ট্যানো জানায় যে, বাসা থেকে ফোন এসেছে। অয়ন ভেবেছে, মৃত্তিকা হয়তো কোন প্রয়োজনে ফোন করেছে। পরক্ষণেই আবার ভাবল, নাহ্, মৃত্তিকাতো বেশ ক’মাস অফিসে এভাবে ফোন করে না। প্রয়োজন হলে এসএমএস করে টুকটাক ফরমায়েসগুলো জানিয়ে রাখে। তাহলে বাসায় কি জরুরী কিছু হলো?

অয়ন ফোনটা ধরে। ওপার থেকে বাবার গলা শুনা যায়, ‘হ্যালো অয়ন, সকালে তোমাকে বলতে ভুলে গেলাম। আজ মৃত্তিকা মা’র জন্মদিন। তাকে একটা সারপ্রাইজ দেবো ভেবেছি। বাসায় একটা আয়োজন করছি। আমি কেক টেকের ব্যবস্থা করছি। তুমি আসার সময় ভালমন্দ একটা গিফ্ট নিয়ে আইস।’

‘ও আচ্ছা।’ বলে ফোনটা রেখে দিল। আবার সে পূর্বের আলোচনায় ডুবে গেল।

নতুন প্রডাক্টগুলো এরি মধ্যে মালয়েশিয়ান একটা কোম্পানীও বাজারে নিয়ে এসেছে। সেগুলোর সাথে তাদেরকে একটা তীব্র প্রতিযোগিতায় যেতে হবে। সেজন্য কাস্টমার বিহেভিয়ার বুঝে গ্রোথ ডেলিভারিটা ফোরকাস্ট করে এগুতে হবে। নইলে মার খেতে হবে। তবে ভরসা হচ্ছে, তার কোম্পানীর গুগউইল, ওয়ার্ক কালচার আর স্কিল্ড স্টাফ সবই আছে। এসব বিষয় পর্যালোচনা চলল সন্ধ্যা পর্যন্ত।

অফিসের ঝামেলা শেষ হতে হতে সেদিন রাত আটটা বেজে গেল। গুছগাছ করে বের হবে, এমন সময় মৃত্তিকার জন্মদিনের বিষয়টা মনে পড়ল। তার বাবা একটা গিফ্ট নিতে বলেছেন। ট্রাফিকের যা অবস্থা, যেতে যেতে শপিং মলগুলোও খোলা পাওয়া যাবে না। কি করা যায়। জুনিয়র এক্সিকিউটিভ অরণিকে ফোন করা যায়। পরক্ষণেই আবার ভাবল, নাহ্, থাক। এসব ব্যক্তিগত বিষয় তার সাথে শেয়ার না করাই ভাল। মৃত্তিকাকে বরং একটা খামে করে কিছু টাকা দিয়ে দেবে। তারটা সেই কিনে নেবেখন।

রাত ন’টার দিকে বাসায় পৌঁছে দেখে সেখানে বেশ বড় সড় আয়োজন। লিভিংরুমে জন্মদিনের কেক সাজানো। সেটার উপর বর্ণিল ক্রিম দিয়ে লেখা আছে হেপি বার্থ ডে টু মুত্তিকা। মৃত্তিকার বাবা-মাও এসেছেন। অয়ন পৌঁছার পর ডিনার শুরু হলো। ডিনার টেবিলে সকলের সাথে টুকটাক কথা হলো তার। ডিনার শেষে কেক কাটা হলো। ছোট ছোট টুকরা করে সবাইকে দেয়া হলো। অয়ন এক ফাঁকে বেডরুমে চলে গেল। সারাদিন বেশ ধকল গেছে। বেশ ক্লান্ত লাগছিল তার।

ওদিকে বাকি সবাই খাবার পর লিভিংরুমে বসে গেল মৃত্তিকার গান শুনতে। মৃত্তিকা হারমোনিয়াম নিয়ে বসল। তার বাবা শামসুল হক খান তবলায় টুকটাক তাল দিতে লেগে গেলেন। ভদ্রতার খাতিরে অয়নও সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকল। এক ফাঁকে উঠে চলে এল সে। গান শেষ হবার পরও বাবা-মা, শ্বশুর-শ্বাশুরী সকলে মিলে অনেক্ষণ গল্প করল। মৃত্তিকাও বসে থাকল তাদের সঙ্গ দিতে।

পরদিন অফিসে যাবার আগে অয়ন মৃত্তিকাকে বেডরুমে ডেকে নিয়ে গেল। একটা খাম তার হাতে দিতে দিতে বলল, ‘কাল তোমার জন্মদিনে ব্যস্ততার জন্য কিছু কিনে আনতে পারিনি। আর আমি কি না কি কিনব, হয়ত তোমার পছন্দ হবে না। এখানে পাঁচ হাজার টাকা আছে। কিছু একটা কিনে নিয়ো।’

মৃত্তিকা কিছুক্ষণ অয়নের দিকে, আবার কিছুক্ষণ খামটার দিকে তাকিয়ে থাকল। পরক্ষণেই বলল, ‘খামটা তোমার কাছেই থাক। তোমার যখন সময় হবে, কিছু একটা কিনে দিয়ো। আর আজ বিকালেই আব্বা-আম্মা চলে যাবেন তো। যাবার সময় তাদেরকে একটু বলে যেও।’

মৃত্তিকা খামটা অয়নের হাতে গুজে দিয়ে বের হয়ে গেল।

অফিসে গিয়ে অয়ন তার কাজের জগতে ডুবে গেল। বিকালে একটু অবসর পেয়ে চেয়ারে গাটা এলিয়ে দিয়ে বসে থাকল কিছুক্ষণ। গতরাতের ভাবনাটা তার মাথায় এলো। মৃত্তিকার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সে এতটা নির্লিপ্ত না থাকলেও পারত। স্ত্রীর জন্মদিনের অনুষ্ঠান, পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী সেখানে আরেকটু স্বতস্ফুর্ত থাকতে পারত সে। বিশেষ করে তার শ্বশুর-শ্বাশুরীইবা কি মনে করলেন।

এক ফাঁকে অরণি এল একটা সার্ভে রিপোর্ট নিয়ে কথা বলতে। কিছুক্ষণ সেই রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করল তারা। সেই আলোচনা শেষ হলে অয়ন কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে থাকল। অরণি বলল, ‘স্যার, আপনার মনে হয় মনটা ভাল নেই?’

যেন সম্বিৎ ফিরে পেল অয়ন। ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘ইটস্ ওকে।’ কয়েক মুহূর্ত নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলল, ‘আপনারতো এখানে ছয় সাত মাস হয়ে গেল, তাই না? অফিস কেমন লাগছে আপনার?’

‘ভাল। খুব ভাল। আই হেভ স্টার্টেড টু লাভ দিস অফিস।’ হাস্যোজ্জ্বল মুখে জবাব দিল সে।

অরণি আজ হাল্কা বেগুনীর উপর লাল কালো ডিজাইন করা কামিজ পড়েছে। একই সাথে চটুল আর দীপ্তিময় লাগছে তাকে। মেয়েটার রুচি আছে। কথাবার্তা ড্রেস আপ-সব ক্ষেত্রেই সেই রুচির পরিচয় মেলে। সাথে সাথে একটা স্বাতন্ত্র্যবোধও দৃষ্টি এড়ায় না।

‘আপনার নামটা কিন্তু সুন্দর। অরণি, মানে কি?’ হাতের কাছে কয়েকটা কাগজ দেখতে দেখতে অনেকটা আনমনে প্রশ্ন করল অয়ন।

অরণি সহাস্যে জবাব দিল, ‘বেশ ইন্টারেস্টিং মিনিং স্যার। চকমকি পাথর।’

অয়নও খানিকটা হেসে দিল। বলল, ‘তাহলেতো ইউ আর এ ডেনজারাস লেডি। কোথায় কখন আগুন লাগিয়ে দিবেন।’

‘মজার ব্যাপার হচ্ছে, চকমকি পাথর নিজে থেকে আগুন জ¦ালাতে পারে না। তার সাথে অন্য পাথরের ঘর্ষণেই কেবল আগুন জ¦লে।’ বলেই আবারো হাসল অরণি।

‘চাকরি-বাকরি করছেন, দেখে শুনে বিয়ে করে ফেলেন এবার। নাকি সেখানেও সেই আগুণ লাগার ভয়?’

‘সে ভয়তো কিছুটা আছেই।’ হালকা হাসির রেখা লেগে আছে অরণির মুখে।

‘ভয় পেয়েতো লাভ নাই। সংসার জীবন শুরু করার আগেতো আর আপনি ফায়ার হ্যাজার্ডের ফরকাস্ট করতে পারছেন না, তাই না?’ মৃদু হেসে অয়ন যোগ করল।

অরণি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়ে বলল, ‘ভাবী কেমন আছেন স্যার?’

কয়েক সেকেন্ডের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল অয়ন। পরে বলল, ‘সী ইজ নাইস।’

‘যে কাজের চাপ আপনার! মনে হয় তাকে একবারেই সময় দিতে পারেন না।’

মৃদু হাসল অয়ন। বলল, ‘সী ইজ অলসো ভেরী বিজি। ফ্যামিলি ইজ অলসো এ বিগ কর্পোরেট হাউজ, ইউ নো?’

দ্’ুজনই হেসে উঠল একসাথে। অরণি বলল, ‘দেটস্ রাইট স্যার।

এরপর হালকা কিছু আলাপচারিতার পর অরণিকে বিদায় দিয়ে অয়ন আবার হাতের কাজগুলোতে মনোনিবেশ করল। সামনে যে কয়টা প্রডাক্ট আসছে, সেগুলোর প্রপার প্রমোশনের মাধ্যমে রেভিনিউ বোস্ট করতে পারলে কোম্পানীতে তার পজিশনটা আরো পাকাপোক্ত হবে। ডিরেক্টর-মার্কেটিং এর পদটা পেতে আর বেগ পেতে হবে না।

এভাবেই চলছিল জীবন। কিন্তু এরি মধ্যে সে বিপর্যয়টা নেমে এল। আবির্ভাব ঘটলো সেই করোনা ইস্যূর। জীবন-যাত্রায় নেমে এল সেই স্থবিরতা।

অয়ন প্রথম কয়েকদিন সকাল বিকাল ভার্চুয়াল অফিসের কাজকর্ম নিয়ে মোটামুটি সময় কাটাচ্ছিল। পরে সেটাও যখন বন্ধ হয়ে গেল, তখন তার সামনে অখন্ড অবসর যেন জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসল। কয়েকদিন শুয়ে বসে টিভি ইন্টারনেট দেখেই কাটিয়ে দিল। এরপর থেকে শুরু হল সেই দম-আটকানো অবসাদ। বাসায় এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়, দুয়েকবার বাবা-মার সাথে এটা সেটা নিয়ে গল্প করে। তাও যেন কয়েক মিনিটেই শেষ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকে। কখনো কখনো অসময়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

অন্যদিকে মৃত্তিকা সকাল থেকেই সাংসারিক কাজকর্ম, শ্বশুর শ্বশুরির যত্ন আত্তি নিয়ে থাকে। অয়নের সাথেও টুকটাক যা কথা হয় যার সবই দৈনন্দিন প্রয়োজন নির্ভর। অয়ন দিন গুণতে থাকে কখন এই দুঃসহ অচলাবস্থার অবসান হবে এই ভেবে।

এভাবে আরো কয়েকদিন গেল।

সেদিন খুব ভোরে অয়নের ঘুম ভেঙ্গে গেল। শুয়ে শুয়েই দক্ষিণের জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে বাইরে তাকাল। তখন ভোরের আলো ফুটছে কেবল। কয়েকটা চড়াই পাখি বিদ্যুতের খাম্বা আর তারে উঠানামা করছে অবিরাম। পাশেই কয়েকটা কাক বেঢপ ডেকে যাচ্ছে। এরি মধ্যে লিভিং রুম থেকে মৃত্তিকার খেয়ালের সুর শোনা যাচ্ছে। আবারো চোখ বন্ধ করে বিছানায় পড়ে থাকল অয়ন। নিদ্রোত্তর আলস্যের ঘোরটা কাটে নাই তখনো। খেয়ালের সুর যেন সেই ঘোরের সাথে একাট্টা হয়ে বাজতে থাকল। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই সুর তার চার পাশে এক অদ্ভুত অনুভুতির ইন্দ্রজাল তৈরী করল। সেইসাথে একটা অব্যক্ত পুলকের শিহরণ যেন জেগে উঠল চৈতন্যের গভীর থেকে গভীরে । বেশ কিছুক্ষণ অর্ধচেতন অবস্থায় সে এই আবেশটি উপভোগ করল। এক সময় বিছানায় উঠে বসল। এমন সুললিত কণ্ঠ মৃত্তিকার! ভেবে বিম্ময় জাগে অয়নের। বিছানা ছেড়ে ধীরে ধীরে সম্মোহিত আকর্ষণে লিভিং রুমে গেল সে। এরি মধ্যে ভোরের আলো ফুটে উঠছে অনেকটা। তুলতুলে নরম সূর্য তখন পূর্বাকাশে সুবর্ণ প্রভার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে কেবল। মৃত্তিকা তখন খেয়াল ছেড়ে গেয়ে যাচ্ছে-

পূর্ব গগনভাগে, দীপ্ত হইল সুপ্রভাত, তরুণারুণ রাগে—-

মাথার নিচে একটি কুশন চেপে দিয়ে মৃত্তিকার সামনের সোফাটিতে হেলান দিয়ে নিঃশব্দে বসে পড়ল অয়ন। একই সাথে কৌতুহল আর বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে থাকল সে। একটা মাদুরের উপর পা গুটিয়ে বসেছে মৃত্তিকা। তানপুরাটা তার কোলের উপর রাখা। সেটাকে বামহাতে আকড়ে ধরে ডানহাতের আঙ্গুল দিয়ে বাজিয়ে যাচ্ছে সে। চোখ দুটো বন্ধ তার। দীর্ঘ ঋজু কেশরাশি সিঁথির দুই পাশ থেকে কটিদেশ পর্যন্ত আলতো করে ঝুলে পড়েছে। ডানদিকে খোলা স্লাইডিং ডোর দিয়ে প্রভাতের সোনালী আলোর কোমল চ্ছটার খানিকটা এলিয়ে পড়া রেশমি চুলের ফাঁক গলে তার চিবুকের কিয়দংশে এসে পড়েছে। সেই আলোয় সে মুখখানায় হিরন্ময় প্রভা যেন ফুটে উঠেছে। অয়ন তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল মৃত্তিকার দিকে। সে যেন এক অচেনা মৃত্তিকাকে দেখছে, যার পরিচয় তার অজানা। অয়ন সঙ্গীতের খুটিনাটি তেমন বুঝে না। কিন্তু সেই সুরের ধারা যে চেনা পৃথিবীর গন্ডি পেরিয়ে কোন এক অসীমের রাজ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে তা যেন বুঝতে পারছে সে। গানের একই কথা মৃত্তিকা কয়েকবার করে গেয়ে যাচ্ছে। গেয়েই চলেছে সে-

অমিত পুণ্যভাগী কে জাগে, কে জাগে—

অয়ন দেখল মৃত্তিকার হৃদয়তন্ত্রীর গভীর থেকে যেন এক অজানা অব্যক্ত বেদনার রোদন অঝোর সুরের ধারায় বের হয়ে আসছে। চোখ থেকে মুক্তার মতো অশ্রু বিন্দু কপোল গড়িয়ে ঝরে পড়ছে। সে মুহূর্তে অয়নের মর্মেও যেন কোথা থেকে এক অজানা হাহাকার জেগে উঠল। চোখ বন্ধ করে নির্বাক বসে রইল সে। দূর অজানার কল্পনার প্রেয়সী, সেই অজানা মৃত্তিকার মুখচ্ছবি তার স্মৃতিপটে ভেসে বেড়াতে থাকল। সে দেখল, পলাশপুরের সবুজ মাঠ-প্রান্তর পেরিয়ে সেই মুখচ্ছবি আকাশের সুদূর নীলিমার আবছা রং মেখে এলোচুলের পর্দার আড়ালে এক ধ্রুপদি চিত্রপট হয়ে আছে।

অয়ন কতক্ষণ এভাবে বসে ছিল, ঠিক মনে নেই তার। যখন ঘোর কাটল, চোখ মেলে দেখল মৃত্তিকা সেখানে নেই। তানপুরাটি ঘরের কোণায় টিপয়ের উপর যতেœ রাখা। তার চোখের নীচটা ভিজে গেছে। উঠে গিয়ে বেসিনে মুখ ধুল সে।

পরে নাস্তার টেবিলে মৃত্তিকাকে সে এক পলক দেখল। ভোরের সেই চিত্রপটের সাথে মেলানোর চেষ্টা করল। পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিল। মৃত্তিকাও নাস্তা সাজিয়ে দিয়ে তার কাজে চলে গেল।

অতপর বিছানায় এসে গাটা এলিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল অয়ন। চৈত্রের মেঘহীন আকাশটার পশ্চাৎপটে কে যেন একটা গভীর নীল সামিয়ানা টানিয়ে রেখেছে। এমন উদাস করা নীল আকাশ সে দেখেছে কি কখনো?

সকালের বেশ কিছুটা সময় এভাবেই ঘোরের মধ্যে কেটে গেল অয়নের। অখন্ড অবসরের সেই দম আটকানো একগুঁয়েমিটা নেই আর। ঘরের ভেতর পায়চারি করল কিছুক্ষণ। এক কোণে রাখা ছোট্ট সেলফটিতে কয়েকটা বই বেশ যত্ন করে রাখা। সেগুলোর সবই কোন না কোন উপলক্ষে মৃত্তিকার দেয়া উপহার। সেখান থেকে ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসটি নিয়ে পড়তে শুরু করল সে। তার হৃদয় মনের সকল মনোযোগ সে বইটাতে ঢেলে দিল। দুপুরের খাবারের আগেই বইটা শেষ করে ফেলল সে। অমিত, লাবণ্য, শোভনলাল, মাসিমা সবাই যেন তার আশে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে তখন। বইটা উল্টে পাল্টে কিছু কিছু অংশ বার বার পড়তে লাগল সে। বিশেষ করে সবশেষ কবিতা খানি যতবার পড়ছে, ততবারই যেন নতুন অর্থ উন্মোচিত হচ্ছে তার কাছে।

এরপর ক্রমান্বয়ে একের পর এক বই ঘেটে দেখে সে। যেটা ভাল লাগে, সেটা পড়ে। একবার পড়া শেষ হলে, সেটি আবার ঘেটে ঘুটে দেখে। গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো আন্ডারলাইন করে রাখে, সেগুলো আবার পড়ে। এক ফাঁকে ‘সোনার তরী’ নিয়ে বসে সে। কবিতাগুলো কেমন যেন দুর্বোধ্য লাগে। একটার পর একটা কবিতা ছেড়ে যায়, পরেরটা পড়ে। মনে পড়ে মৃত্তিকা বলেছিল, ‘সবগুলো কবিতা পড়তে না পারলেও ‘সোনার তরী’ আর ‘মানস সুন্দরী’ কবিতা দ্ইুটা মনোযোগ দিয়া পড়বা। বুঝার চেষ্টা করবা। ভাল লাগবে।’ এই দুইটি কবিতা নিয়ে সে পুরো এক বেলা কাটিয়ে দিল। এখানেও ঠিক একই ব্যাপার। বার বার পড়ে, প্রতিবারই নতুন তাৎপর্য খুঁজে পায়।

সময় যেন কোথা দিয়ে চলে যায়, টেরই পায় না অয়ন। এরই মধ্যে খাবার টেবিলে, কাজের ফাঁকে এখানে সেখানে মৃত্তিকার সাথে দেখা হয় তার। এক দুই পলক তার মুখখানি দেখে সে। মৃত্তিকাও সংসারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। প্রয়োজনীয় এটা সেটা অয়নকে এগিয়ে দেয়। রাতে বিছানায় গুটিশুটি হয়ে শুয়ে থাকে। অয়নও ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। তার আর মৃত্তিকার মাঝখানে কে যেন সংকোচ আর জড়তার একটা পর্দা টানিয়ে দিয়েছে। চেনা মৃত্তিকাকে কেমন যেন অচেনা লাগে। বাস্তব আর কল্পনার সংমিশ্রণে গাম্ভীর্য আর সম্ভ্রমে মোড়ানো এক মরীচিকার ইন্দ্রজালে যেন দুর্লভ হয়ে বিরাজ করতে থাকে সে।

দু’দিন এভাবে গেল। সেদিন রাতের খাবার শেষে সবাই যার যার মতো ঘুমাতে চলে গেছে। অয়ন খাটের এক পাশে বালিশে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ধ্যানমগ্ন হয়ে শুয়ে আছে। মৃত্তিকা এসে বেডরুমের এটা সেটা টুকটাক গুঁছিয়ে রাখল। অতপর অয়নের পাশে গিয়ে পিছন ফিরে বসল। মৃত্তিকা নিজ চুলের বিনুনি আঁটতে আঁটতে বলল, ‘একটা কথার সত্যি জবাব দেবে?’

অয়ন চোখ তোলে তাকাল। উত্তরের অপেক্ষা না করেই মৃত্তিকা আপন মনে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি কারো প্রেমে পড়েছ? মানে এক্সট্রা মেরিটাল এফেয়ার?’

অয়ন চোখ মেলে তাকাল। খানিকটা মুচকি হাসল। কোন উত্তর দিল না।

মৃত্তিকা চুলের বিনুনিটা পিঠে ঠেলে দিল। বলল, ‘তার নামটা কি বলবে?’

সুদূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অয়ন ধীরে ধীরে বলল, ‘তার একটা নাম আমি কবিগুরুর কাছ থেকে ধার নিয়েছি’। একটু থেমে দৃঢ় স্বরে ধীরে উচ্চারণ করল, ‘ক-ল্প-না-ল-তা।’

অয়ন উঠে বসল। মৃত্তিকাও অয়নের দিকে মুখ ফিরাল। দুজনের দৃষ্টিতেই বিস্ময়। অয়ন মৃত্তিকার চিবুক স্পর্শ করল। আরো কাছে এসে সোজা মৃত্তিকার চোখের দিকে তাকাল। অয়ন দেখল, দক্ষ শিল্পীর খুঁদাই করা শ্যামল সুডৌল দৃঢ় ছাঁচের ভেতর নীলমণি অক্ষিগোলক ¯িœগ্ধ আলোয় জ¦ল জ¦ল করছে। অয়নের দৃষ্টি সেই আলো ভেদ করে আরো গভীরে কোন এক কল্পলোকে পৌঁছে গেল। তার সমস্ত চৈতন্য জুড়ে সেদিনের সেই সঙ্গীতের সুর যেন বেজে উঠল। আর সেই সুরের মূর্ছনায় সেই কল্পলোকে তার কল্পনার মৃত্তিকার ধ্রুপদি চিত্রপট ভেসে উঠল। বিহ্বলতার সাথে বলে উঠল অয়ন, ‘ঐতো, ঐতো আমার কল্পনালতা। মৃত্তিকা, আমি দেখতে পাচ্ছি তাকে। সে তুমি নও, কিন্তু তোমার ভেতরেই তার বাস।’ অয়নের চোখে অশ্রু জমে উঠল।

মৃত্তিকা আরো কাছে এসে অয়নের বক্ষে লুটিয়ে পড়ল। তার চোখ থেকে বিন্দু বিন্দু অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। অয়ন পরম ভালবাসায় জড়িয়ে ধরল তাকে।

লেখক পরিচিতি

এম. এ কামাল বিল্লাহ্, জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলায় ১৯৬৮ সালে। ভৈরব থেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পরে ২০০৯ সালে ডিএফআইডি’র স্কলারশিপে যুক্তরাজ্যের হাল ইউনিভার্সিটি থেকে জেন্ডার এন্ড ডেভ্লপমেন্টের উপর মাস্টার্স করেছেন। তিনি ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সরকারের যুগ্ম-সচিব।